October 10, 2026, 7:29 pm

এক বছরেই পাচার ৭৫ হাজার কোটি টাকা

এক বছরেই পাচার ৭৫ হাজার কোটি টাকা

গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাচার হয়েছে ৭৫ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এটি চলতি বাজেটের ১৬ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। আর বিগত ৪৬ বছরে (১৯৭২-২০১৯) দেশ থেকে ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এটি জাতীয় বাজেটের (৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা) প্রায় দেড়গুণ।

অর্থ পাচারের এই তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাতের গবেষণায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সমাজ সমগ্রকের রাজনৈতিক অর্থনীতি : শোভন সমাজ অর্থনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক গবেষণা বইয়ে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি বলছে, ২০১৫ সালে বাণিজ্য কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বিদেশে পাচার হয়েছে।

ড. আবুল বারকাতের গবেষণায় বলা হয়, বিদেশে মোট পাচার করা অর্থ তিনটি উৎস থেকে তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে শুল্ককর ফাঁকি খাত থেকে ৬৫ শতাংশ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ বাণিজ্যের অন্তরালে শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধ অর্জিত অর্থ পাচার করা হচ্ছে। ৩০ শতাংশ পাচারকৃত অর্থ আসছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ থেকে এবং বাকি ৫ শতাংশ ঘুষ বাণিজ্য থেকে। তবে স্থান, কাল-পাত্রভেদে পাচারকৃত অর্থের উৎসের পরিমাণের অনুপাত পরিবর্তন হতে পারে। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, মেক্সিকোতে অর্থ পাচারের বড় অংশ আসছে ক্রাইম-ড্রাগ-ক্রাইম থেকে। নাইজেরিয়ায় পাচারকৃত অর্থের বড় অংশ আসছে করশুল্ক ফাঁকির ঘটনায় এবং চীনের পাচারকৃত অর্থের বড় অংশ আসছে ঘুষ বাণিজ্য থেকে।

গবেষণায় দেখানো হয়, এই পাচারকৃত অর্থ ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে সাদা করার পর প্রধানত তিন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ আনুমানিক ৩০ শতাংশ (পাচারকৃত অর্থের) আইনিভাবে বৈধ ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। আর বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে রাখা হয় ২৫ শতাংশ। এছাড়া ঘুষ বাণিজ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে আরও ২৫ শতাংশ। বাকি ২০ শতাংশ যাচ্ছে বিলাসী জীবনযাপনের, বিশেষ করে দামি ভিলা, দালানকোঠা কেনা, জমি ক্রয়, দামি গাড়ি, হীরা-মণি-মুক্তা সোনাদানা ক্রয়, ক্যাসিনোতে জুয়া খেলা। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির পাচারকারীরা এই টাকায় দেশ ভ্রমণও করছেন।

অর্থ পাচার প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম মিজানুর রহমান সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা লুটপাট ও আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করছে। অথচ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুই করতে পারছে না। তাহলে এই অনুমোদন তো অর্থহীন। এটা অন্তত আর যাই হোক শোভন সমাজের কার্যকলাপ হতে পারে না।

এদিকে দেশের অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচারের যেসব ঘটনা আদালতে আসছে সেগুলো সিন্ধুতে বিন্দুর মতো। অর্থাৎ বেশিরভাগ ঘটনা কেউ জানেই না। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার কয়েকভাবে হয়ে থাকে। এর একটি বড় উপায় হচ্ছে বাণিজ্য কারসাজি। বাণিজ্য কারসাজির মাধ্যমে যখন কোনো পণ্য আমদানি করা হয়, তখন কম দামের পণ্যকে বেশি দাম দেখানো হয়, ফলে অতিরিক্ত অর্থ দেশের বাইরে থেকে যায়। একইভাবে রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশি দামের পণ্যকে কম দাম দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দেশে আনা হয় না।

গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়, এখন পৃথিবীতে বছরে অর্থ পাচার বা মানিলন্ডারিং এর পরিমান আনুমানিক ২ লাখ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ১৬৬ লাখ কোটি টাকা। এটি বৈশ্বিক জিডিপির ৫ শতাংশের সমান। ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি রিপোর্টে (২০১৯) বিশ্বব্যাপী বার্ষিক অর্থ পাচারের পরিমাণও বৈশ্বিক জিডিপির ৫ শতাংশের সমান বলে উল্লেখ করেছে।

সেখানে আরও বলা হয়, অর্থ পাচারের পরিমাণ দেশভিত্তিক উল্লেখ করলে সংশ্লিষ্ট দেশের জিডিপির সর্বনিম্ন ১ থেকে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত পাচার হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) জিডিপির আকার হচ্ছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

প্রসঙ্গত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান টিআইজিইআর (ট্রান্সফরমেশন, ইন্টিগ্রেশন, গ্লোবালাইজেশন, ইকোনমিক, রিচার্স)-এর সায়েন্টিফিক রিসার্চ অ্যাডভাইজারি বোর্ডের (এসএবি) সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। যুগান্তরকে এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এই গবেষণাটি তিনি ২০ বছর ধরে করছেন। যা সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

তার এই গবেষণায় বিদেশে টাকা পাচারের জন্য তিনটি স্তর অতিক্রম করতে হয় বলে বলা হয়। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে পাচারকারীরা তাদের নগদ অর্থ বিদেশি মুদ্রায় বিশ্বের কোনো না কোনো বড় ব্যাংকে জমা করেন। এরপর জমাকৃত অর্থ পৃথিবীর একশ থেকে দেড়শ ছোট ছোট ব্যাংক বা মানি চেঞ্জার হাউজে ছড়িয়ে দেন। এরপর লাটাই ঘুটিয়ে সব একীভূত করেন।

ঘটনাটি এভাবে ঘটে অর্থাৎ পাচারকারীরা প্রথমে কোনো না কোনো বড় ব্যাংকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য (বড়জোর ১-২ ঘণ্টা) জমা করেন। ওই সময়ের মধ্যে তার এসব অর্থ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে, লাতিন আমেরিকায় ও আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে কিছু ছোট ছোট ব্যাংক বা মানিচেঞ্জার আছে সেখানে ছড়িয়ে দেন। যাকে বলে ট্যাক্স হ্যাভেন। এরপর সবগুলো টাকা পুনরায় একত্র করা হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নেওয়া স্তরে স্তরে ছড়িয়ে দিতে পারলেই পাচারকৃত অর্থ লন্ড্রি কাজ হয়ে যায়। অর্থাৎ নোংরা-দুর্গন্ধযুক্ত পাচার করা অর্থ ধুয়েমুছে সাদা হয়ে যাচ্ছে।

বিজনেস নিউজ/এসআর

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com